ধারাবাহিক গল্প অভিশাপ,২৫ পর্ব :সাব্বির আহমেদ

শিরোনাম শিল্প-সাহিত্য
অভিশাপ ২৫ পর্ব : সাব্বির আহমেদ
ভাবির আচমকা সিদ্ধান্ত সবাইকে চমকে দিয়েছিল,এক অভাবনিয় পরিবর্ত আসলো আমার জীবনে।মানিকের মা মানে আমার শাশুড়ী আম্মা খুব সহজেই মেনে নিয়েছেন আমদের বিয়ে।আমার দেবরটাতো মহা খুশি।আমি ভাবতেই পারছি না কি ভাবে কি হয়ে গেল!বিয়েতে সব খরচই ভাবি করেছেন,আমার জন্য একটা লাল কাতান শাড়ি আর মানিকের জন্য পান্জাবি পাজামা কিনে দিয়েছিলেন।আমার সেই শাড়িটা আজও তেমনই আছে।
বিয়ের পরের দিন মানিক মেস ছেড়ে ফ্যামিলী বাসা ভাড়া করলো সবাইকে ছেড়ে মানিকের হাত ধরে সেখানে উঠলাম,এমনকি নুসরাত কেও মায়ের কাছে রেখে এসেছিলাম।আমি চাইনি মানিকের ঘাড়ে বোঝা হয়ে নুসরাত বড় হোক।শুধু নুসরাতের পরিচয়টা হোক মানিকের পরিচয়ে এটাই ওর অনেক বড় পাওয়া।আসার সময় নুসরাত অনেক কেঁদেছিলো সবাই বলতে লাগলো ওকে নিয়ে আসতে,শুধুমাত্র ভাবিই বললেন না,এটাই তোর সঠিক সিদ্ধান্ত।বুকে পাথর চাপা দিয়ে ওকে রেখে আসতে হয়েছিলো।প্রথম দিকে নুসরাতের প্রতি মানিকের একটু আগ্রহ থাকলেও পরবর্তিতে তা আর তেমনটা ছিলো না।মাঝে মধ্যে মা ওকে নিয়ে আমাদের বাসায় আসতো  এভাবে কিছুদিন যাবার পর মানিকের অন্য গার্মেন্টস থেকে ফ্লোর ইনচার্জ পদে চাকরির  অফার আসলো বেতন আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি,বুঝতেই পারছেন এই সুযোগ হাত ছাড়া করা যায়?
সে কারণেই বাসা পরিবর্তন করে আমাদেরকে সেখানেই চলে যেতে হল।যাওয়ার সময় মানিকের কান্ড দেখে আমি হতবাক হয়ে গেলাম,জানিনা কি কারণে ও এটা করলো।সমস্ত মালপত্র যখন ট্রাকে উঠানো শেষ ও মাকে বললো আমাদের জন্য দোয়া করবেন আর মাঝে মধ্যে গিয়ে আমাদের দেখে আসবেন,তবে নুসরাতকে নিয়ে যাবেন না বুঝতেই পারছেন ওখানে আমার অনেক বন্ধু বান্ধব আছে যারা ওর ব্যাপারে কিছুই জানেনা।মা এই কথা শুনে সেদিন  অনেক দুঃখ পেয়েছিলো।সেই দিন না বুঝলেও পরে বুঝতে পেরেছিলাম আমাদের সমাজে কিছু মানুষ আছে যারা মানুষের দুর্বল জায়গায় আঘাত করে মজা পায়।কেউ হয়তো নুসরাতকে নিয়ে ওকে কিছু বলেছে না হলে মানিকের হঠাৎ‌ এই পরিবর্তনের কি কারণ হতে পারে?মানিকের মা বেশ কয়েক বার এসেছেন আমাদের বাসায়,তার আচরনেও ব্যতিক্রম কিছু দেখিনাই,তার সামনে যতবারই নুসরাতের কথা তুলতে গেছি ততবারই তিনি এড়িয়ে গেছেন।
মানিকের মায়ের আচরণে এটা তো পরিষ্কার যে তিনি শুধু আমাকে মেনে নিয়েছেন ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে,না হলে হয়তো মানতেন না।সেই তো,আমাকে মেনে নিয়েছে এইতো সৌভাগ্য আমার।কিন্ত আমার দেবর আর ননদ ওদের কাছে নুসরাতের জন্য স্নেহ মায়ার কোন কমতি নেই।গত মাসে মনিকা এসেছিল যখন দেখল নুসরাত আমাদের সাথে নাই,তখন কেউ না দেখলেও আমি দেখেছি তার তিরস্কার মিশ্রিত চাহনি।পরের দিন গিয়ে নুসরাতকে নিয়ে আসল।ওকে দেখে আমার শরির কাপতে শুরু করেছে ও দৌড়ে এসে আমার বুকের মধ্যে ঝাপিয়ে পরে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগলো,ওর উষ্ণ চোখের জলে আমার বুক ভিজে গেল।নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না ওর মাথাটা বুকের সাথে চেপে ধরে হাওমাও করে কেঁদে ফেললাম।আর ভাবতে লাগলাম এ আমি কি করেছি?নিজের সুখের জন্য ওর জীবনটা কি আমি নষ্ট করে দিলাম?কিই বা করার ছিল আমার,আমিও তো মানুষ,আমারও তো অধিকার আছে সামান্য একটু সুখের।এমন অনেক ভাবনায় মনের মধ্য ঝড় তুলেছে,পারছি না নিজেকে নিয়ন্ত্রন করতে,কি করবো এখন?
নুসরাত দু হাত দিয়ে আমার চোখ মুছে দিতে দিতে বলতে লাগলো তুমি কেঁদো না আম্মু আমি আর কোনদিন তোমাদের বিরক্ত করতে আসব না।আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি,জানো আম্মু তোমার ছবি নিয়ে আমি সারা রাত ঘুমিয়ে থাকি।ওর মুখটা দুই হাতে ধরে চুমু দিতে দিতে বলতে লাগলাম ওরে আমার সোনামনি ওরে আমার যাদুমনি কেন আমি তোরে এত কষ্ট দিলাম?তুই তোর এই স্বার্থপর মা টাকে ক্ষমা করে দিস মা।নুসরাতও আমাকে পাল্টা চুমু দিতে দিতে বলল এভাবে কেঁদো না তুমি তো আমার ভালো আম্মু,এভাবে কাঁদবেই যদি তাহলে আমাকে ফেলে এসেছ কেন? মনিকা পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের মা মেয়ের ভালোবাসার মুহুর্তটুকো হৃদয়ে ধারণ করেছিল।
তারপর বললো হয়েছে হয়েছে এবার সবাই তো ঘরে চলো, তারপর দেখব মা-মেয়ের কত ভালোবাসা আছে।আজকে আমি মহা খুশি আমার মেয়েকে কাছে পেয়েছি, মনিকাকে বললাম ধন্যবাদ,কিন্তু তোমার ভাই যদি কিছু বলে?মনিকা বলল কোন কথা হবে না ভাইয়াকে যা বলার আমি বলবো।দেখতে দেখতে রাত হয়ে গেল মনিকা নুসরাতকে ঘুম পাড়িয়ে ওর পাশে শুয়ে আছে,আমি বারান্দায় বসে ছিলাম নয়টার দিকে মানিক আসলো আমাকে দেখেই বলে উঠলো কী ব্যাপার আজকে দেখছি খুশি খুশি,এমন কোন খুশির সংবাদ আছে নাকি?ঘরের সামনে বাড়তি দুই জোড়া জুতা দেখে মানিকের কৌতুহলী দৃষ্টিতে আমার দিকে? আমি বললাম মনিকা এসেছে সাথে করে নুসরাতকে নিয়ে এসেছে।মানিক রাগান্বিত হয়ে বলল কি বললে?চলবে।
পোস্টটি শেয়ার করুন