চলে গেলেন না ফেরার দেশে সংগীত গবেষক মোবারক হোসেন খান

শিরোনাম শিল্প-সাহিত্য
চলে গেলেন না ফেরার দেশে সংগীত গবেষক মোবারক হোসেন খান (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মোবারক হোসেন খান, ১৯৩৮ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির ত্রিপুরা রাজ্যের (বর্তমান বাংলাদেশ) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের শিবপুর গ্রামের এক সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সুরসাধক ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ একজন প্রখ্যাত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ। তার মাতার নাম উমার-উন-নেসা। তার চাচা সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ উপমহাদেশের প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ।
ছয় ভাইবোনের মধ্যে মোবারক সর্বকনিষ্ঠ। তার বড় তিন বোন আম্বিয়া, কোহিনূর, ও রাজিয়া এবং বড় দুই ভাই প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ আবেদ হোসেন খান ও বাহাদুর হোসেন খান।
পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী বড় দুই ভাই সঙ্গীতে মগ্ন থাকায় পিতা আয়েত আলী খাঁ চেয়েছিলেন মোবারক হোসেন খান যেন সঙ্গীতের পাশাপাশি পড়াশুনা করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তারা সপরিবারে কুমিল্লা বসবাস করেন। মোবারক সেখান কুমিল্লা জিলা স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৫২ সালে মেট্রিক পাস করেন। পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাস বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
মোবারক হোসেন খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল থেকে কৃতিত্বের সাথে পড়াশোনা শেষে ১৯৬২ সালের ২০ অক্টোবর মোবারক হোসেন খান কর্মজীবন শুরু করেন। শুরুটা বাংলাদেশ বেতারের অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে। বাংলাদেশ বেতারে যোগ দিয়ে এক পর্যায়ে বেতারের সিনিয়র পরিচালক পদ লাভ করেন। তিনি বেতারের ৩০ বছর কর্মরত ছিলেন।
বাংলাদেশ শিল্পকাল একাডেমীর মহাপরিচালক এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠান নজরুল ইন্সটিটিউটের ট্র্যাস্টি বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি মৃত্যুর আগপর্যন্ত আমেরিকার আন্তর্জাতিক সংগীত বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর ট্র্যাডিশনাল মিউজিক’(আইসিটিএম)-এর বাংলাদেশ চ্যাপটারের সভাপতি এবং তিনি ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ সংগীত নিকেতন এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
একাধারে একজন সুরবাহার শিল্পী, সংগীত গবেষক, লেখক, অনুবাদক মোবারক হোসেন খান। সূদীর্ঘকাল যাবৎ বিশ্বসাহিত্যের গল্প, উপন্যাস, নাটক অনুবাদ করে বাংলা সাহিত্য ভূবনকে সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা অনুবাদ সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব মোবারক হোসেন খান। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুইডিশ বিশ্বকোষে তাঁর রচিত ‘বাংলাদেশের সংগীত’ বিষয়ক নিবন্ধন প্রকাশিত হয়েছে।
কবি আল মাহমুদ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সহকারী পরিচালক থাকা কালীণ ১৯৮০ সালে শিল্পকলা একাডেমি থেকে প্রকাশ করেন মোবারক হোসেন খানের প্রথম সঙ্গীত বিষয়ক বই ‘সংগীত প্রসঙ্গ’। বিভিন্ন পত্রিকায় তার সঙ্গীত বিষয়ক লেখা নিয়ে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় বই ‘বাদ্যযন্ত্র প্রসঙ্গ’। এরপর তিনি রচনা করেন ‘সঙ্গীত মালিকা’। এই বইটিও প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। পরবর্তীতে তিনি সঙ্গীত ও শিশু বিষয়ক ৫০টির মত গ্রন্থ রচনা করেন।
তার রচিত গ্রন্থ গলো হচ্ছে-
বাংলা ভাষায় রচিত সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থঃ
সংগীত প্রসঙ্গ (১৯৮০), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ (১৯৮১), মুক্তধারা, ঢাকা। বাদ্যযন্ত্র প্রসঙ্গ (১৯৮২), বাংলা একাডেমি। রাগ সংগীত (১৯৮৫), বাংলা একাডেমি। যন্ত্রসাধন (১৯৮৬), বাংলা একাডেমি। সংগীত গুনীজন (১৯৮৬), ঢাকা: মুক্তধারা। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ ও তার পত্রাবলি (১৯৮৬), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। সংগীত মালিকা (১৯৮৭), বাংলা একাডেমি। কণ্ঠসাধন (১৯৮৯), বাংলা একাডেমি। মুক্তিযুদ্ধের গান (১৯৯১), ঢাকা: শোভা প্রকাশ। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ (১৯৯৪), ঢাকা: আগামী প্রকাশনী। আমি যে বাজিয়েছিলেম (১৯৯৭), একাডেমিক প্রেস এন্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরি। সংগীত দর্পণ (১৯৯৯), বাংলা একাডেমি। উচ্চাঙ্গ সংগীত (১৯৯৯), বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। গড়লো যারা সুরের তাজমহল (১৯৯৯), ঢাকা: মুক্তধারা। সংগীতামৃত (২০০১), ঢাকা: শোভা প্রকাশ। ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ : জীবন ও সাধনা (২০০৩), বাংলা একাডেমি। সংগীতসাধক অভিধান (২০০৩), বাংলা একাডেমি। আমার সংগীত স্বজন (২০০৪), ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স। গীত মঞ্জুরী (২০০৫), বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। নজরুল সংগীতের বিচিত্র ধারা (২০০৫), নজরুল ইনস্টিটিউট। সুরের স্বরলিপি, ঢাকা: মুক্তধারা। সঙ্গীত সন্দর্শন, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ। নজরুল সংগীত প্রসঙ্গ, সুচয়নী পাবলিশার্স। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ দশ সঙ্গীতজ্ঞ, সাহিত্য প্রকাশ।
ইংরেজি ভাষায় রচিত গ্রন্থঃ
Music and its study (সংগীত ও এর গবেষণা) (১৯৮৮), নয়াদিল্লী: স্টারলিং পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। Islamic Contribution to South Asia’s Classical Music (দক্ষিণ এশিয়ার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে মুসলমানদের অবদান) (১৯৯২), নয়াদিল্লী: স্টারলিং পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। Ustad Alauddin Khan: The Legend in Music (ওস্তাদ আলাউদ্দিন খান: সঙ্গীতের কিংবদন্তী) (২০০২), নয়াদিল্লী: স্টারলিং পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড।
তার রচিত শিশুতোষ সঙ্গীত বিষয়ক গ্রন্থঃ
সুরেলা টইটম্বুর (১৯৯৯), ঢাকা: শোভা প্রকাশ। ছোটদের সারেগামা ও সংগীতবিদ্যা (২০০২), ঢাকা: আহমদ পাবলিশিং হাউজ। ছোটদের সংগীত গুনীজন (২০০৪), ঢাকা: মাম্মী প্রকাশনী। সুর লহরী (১৯৭০, পুনঃমুদ্রণ ১৯৭২), বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। সুরের রাজা (১৯৭৯), ঢাকা: মুক্তধারা। সুর নিয়ে যার খেলা (১৯৮১), বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। ছোটদের আলাউদ্দিন (১৯৮২), বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন।
এছাড়াও তিনি লিখেছেন শিশুতোষ অনেক গ্রন্থ।
তার শিশুতোষ গ্রন্থঃ
সিন্ডারেলা, জনতা প্রকাশ। কুমির আর শিয়াল, জনতা প্রকাশ। চরকা বুড়ি, জনতা প্রকাশ। বুদ্ধির জয়, জনতা প্রকাশ। উপকারের ফল, জনতা প্রকাশ। সততার পুরস্কার, জনতা প্রকাশ। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা, আহমদ পাবলিশিং হাউজ। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়, জনতা প্রকাশ। গ্রামীণ গল্প, শিকড়। এশিয়ার লোককাহিনী, অয়ন প্রকাশন। রবিন হুড, প্রকাশ ভবন। সাগরের হাতছানি, প্রকাশ ভবন।
মোবারক হোসেন খান অনুবাদ করেছেন অনেক গ্রন্থ।
তার অনুবাদ সমূহঃ
আফ্রিকার নির্বাচিত গল্প (১৯৮৫), ঢাকা: রূপম প্রকাশনী। পৃথিবীর সেরা গল্প (১৯৮৫), ঢাকা: বিউটি বুক হাউজ। নোবেল বিজয়ীদের নির্বাচিত গল্প (১৯৯১), ঢাকা: রূপম প্রকাশনী। নোবেল পুলিৎজার ও বুকার বিজয়ীদের শ্রেষ্ঠ গল্প, পলল প্রকাশনী। শতাব্দীর সেরা গোয়েন্দা রহস্য, ঝিনুক প্রকাশ। আইভানহো (১৯৭৮), ঢাকা: মুক্তধারা। নিসঙ্গ (১৯৭৯), বাংলা একাডেমি। ক্যাপ্টেন-দুহিতা (১৯৮১), ঢাকা: মুক্তধারা। শিকারীর গুহা (১৯৮১), বাংলা একাডেমি। তিন তরঙ্গ (১৯৮৩), বাংলা একাডেমি।
তার রচিত উপন্যাস গ্রন্থঃ
হত্যাকারী (১৯৮৫), ঢাকা: সেবা প্রকাশনী। নিহত আগন্তুক (১৯৮৭), ঢাকা: অক্ষর প্রকাশনী।
তিনি রচনা করেছেন আত্মজীবনী গ্রন্থঃ
জীবন স্মৃতি (১৯৯৮), ঢাকা: আগামী প্রকাশনী এবং আমার যুগ আমার স্মৃতি (১৯৯৯), ঢাকা: শোভা প্রকাশ।
মোবারক হোসেন জীবনে অনেক সম্মাননা লাভ করেনঃ
সম্মাননা সমূহঃ
একুশে ও স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত সুরসাধক ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর তৃতীয় ছেলে মোবারক হোসেন খান। যিনি নিজেও একুশে ও স্বাধীনতা পদকসহ দেশ বিদেশের অনেক সম্মাননার অধিকারী। সঙ্গীতে অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত একুশে পদক। সঙ্গীতে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে পেয়েছেন ‘কুমিল্লা ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক’। সঙ্গীতে অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার। ২০০২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার। অনুবাদে ‘অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার’। ২০০৮ সালে একুশে একাডেমি অস্ট্রেলিয়া থেকে সংবর্ধনা। ২০১৬ সালে ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’ সম্মাননা।
মোবারক হোসেন খানের সাথে যেভাবে পরিচয়ঃ
শুরুতেই জানিয়ে রাখা দরকার সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ ও তাঁর ঐতিহাসিক সংগীতজ্ঞ পরিবার নিয়ে আমার দূর্বলতা প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময়ের। এরই ধারাবাহিকতায় আমি গণমাধ্যম ও ফ্রিল্যান্সার হিসেবে বিভিন্ন ভাবে কাজ শুরু করি পরিবারটি নিয়ে।
প্রাচীনতম সাপ্তাহিক সংবাদ পত্র ‘আমোদ’এ আলাউদ্দিন খাঁকে নিয়ে ২০১৪ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হলে নজরে আসে মোবারক হোসেন খানের। তিনি পত্রিকা অফিস থেকে আমার ফোন নম্বর নিয়ে আমাকে কল করে অনেক প্রসংশা ও দোয়া করেন। সেদিন আমার কাছে মনে হয়েছিল আমি বুঝি নোবেল পুরস্কার পেয়েছি! এরপর সুর সম্রাট ড. ওস্তাদ আলা উদ্দিন খাঁ’ ও ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁকে নিয়ে করা একটি ডকোমেন্টারিতে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে গিয়ে প্রথম বারের মতো গূণী ব্যাক্তিত্ব মোবারক হোসেন খানের সান্যিধ্য লাভ করি।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালে আমি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের পরিবার নিয়ে টেলিভিশনে প্রতিবেদন তৈরীতে মনোনিবেশ করি। সেই থেকে এই পরিবারের সাথে যোগাযোগ শুরু হয়। শুরু হয় তাদের বাসায় যাতায়াত। ধীরে ধীরে প্রসঙ্গ ক্রমে জানতে পারি শুধু মোবারক হোসেন খানের নিজের পরিবারই নয়, তার স্ত্রী ফওজিয়া ইয়াসমিন ষাটের দশকের খ্যাতিমান শিল্পী এবং তার পরিবারের অনেক সদস্য দেশের খ্যাতিমান সংগীত শিল্পী, চলচ্চিত্র নির্মাতা।
মোবারক হোসেন খানের প্রতিটি সজনই যেন একেকটি প্রতিষ্ঠান। তিনি সুর সম্রাট ড. ওস্তাদ আলা উদ্দিন খাঁ’র ভাতিজা। সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে আছে মোবারক হোসেন খানের বহু খ্যাতিমান সজন। এতো অল্পপরিসরে তাদের চেনানো কঠিন।
এতো বিশাল এক সংগীত পরিবার দুনিয়াজুড়ে আরেকটিও নেই। দুনিয়া জুড়ে খ্যাতি এমন এক বিশাল সংগীত পরিবারে জন্ম নেয়া মোবারক হোসেন খানের বড় ভাই ওস্তাদ আবেদ হোসেন খান (বিশিষ্ট সেতার শিল্পী), মেজ ভাই বাহাদুর হোসেন খান (একসময়ের ভারতের খ্যাতিমান সরোদ শিল্পী), ছোট ভাই বহু জনপ্রিয় গানের সংগীত পরিচালক সুরকার শেখ সাদী খান (বেহালা শিল্পী) দেশের অনেক বিখ্যাত গানের শ্রষ্টা হিসেবে যার খ্যাতি, মোবারক হোসেন খানের ছোট ভাই তানসেন খান (বাংলাদেশ বেতারে গিটার শিল্পী ছিলেন) অকালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি এবং বিটোফেন খানও (গিটার শিল্পী), ছোট বোন মমতা খানম চট্টগ্রাম বেতারে নিয়মিত শিল্পী ছিলেন।
চাচাতো ভাই বিশ্ব বরেণ্য সরোদ শিল্পী উস্তাদ ড. আলী আকবর খাঁ। ভারতের সঙ্গীত জগতে সরোদের কিংবদন্তি মনে করা হয় তাঁকে। তিনি ভারতেব রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পদ্মভূষণ এবং পদ্মবিভূষণ খেতাব প্রাপ্ত, তার ছেলে আশীষ খাঁ (বর্তমান বিশ্বে খ্যাতিমান সরোদ শিল্পী), চাচাতো বোন খ্যাতিমান সুরবাহার শিল্পী রওশন আরা বেগম অন্নপূর্ণা দেবী। তিনি বিশ্ব খ্যাত বাঁশি বাদক পণ্ডিত হরি প্রসাদ চৌরাশিয়ার সংগীত গুরু। অন্নপূর্ণা ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক পদ্মভূষণ লাভ করেন। অন্নপূর্ণার স্বামী বিশ্ব বরেণ্য সেতার শিল্পী পণ্ডিত রবিশংকর (ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ভারত রত্ন খেতাবে ভুষিত।
এছাড়াও মোবারক হোসেন খানের স্ত্রী ফওজিয়া ইয়াসমীনও একসময়ের খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী, স্ত্রীর বড়বোন ফরিদা ইয়াসমীন, শ্যালিকা নিলুফার ইয়াসমীন, ছোট শ্যালিকা সাবিনা ইয়াসমীন এবং মোবারক হোসেন খানের ছোট ভায়রা ভাই চলচ্চিত্র ও সংগীত পরিচালক খান আতাউর রহমান ও তাঁর ছেলে কণ্ঠশিল্পী আগুণ। তাদের নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেবার কোন অবকাশ নেই। তারা সবাই এদেশের সংগীত জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র।
এদিকে এই পরিবার নিয়ে আমার কৌতুহল বেড়েই চলছে। আমি খোঁজতে শুরু করি দেশ বিদেশে অবস্থান করা এই বিশাল সংগীতজ্ঞ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কে কোথায় আছে। এরই ধারাবাহিকতায় ভারচুয়াল মাধ্যমে পরিচয় হয় অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত মোবারক হোসেন খানের ছোট ছেলে তানিম হায়াত খান রাজিত এর সাথে। পরে তিনি দেশে এলে আমাদের সম্পর্ক আরোও গভীর হয়।
২০১৬ সালের শেষ দিকের কথা। রাজিত ভাই দেশে আসলেন। আমি ব্যস্ত হই তাকে নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনে। আমার স্বপ্নের প্লাটফর্ম সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’র ব্যানারে দ্বিতীয় বারের মতো আয়োজন করি “ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ, সাধক ফকির আফতাব উউদ্দীন খাঁ এবং মহর্ষি মনোমোহন দত্ত স্মরণ উৎসব”।
আয়োজনটি করেছিলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে। ওই অনুষ্ঠানে সরোদে রাগ আর ধুন পরিবেশন করে রক্তে মাংসে সংগীতের উত্তরাধিকারের বিষয়টি জানান দেন তানিম হায়াত খান রাজিত। জানান দেন এই শহরে সংগীতে রাজত্ব ছিলো তার পূর্বসূরীদের। সাথে তবলায় সংগত করেন তারই বন্ধু সঞ্জিব মজুমদার। দুজনের চমৎকার বাদনে মুগ্ধতায় মন ভরিয়ে তোলে মিলনায়তনে কানায় কানায় পরিপূর্ণ দর্শকদের।
এর আগে ১৮ নভেম্বর ২০১৬ শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথমবারের মতো ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’ আয়োজিত সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ- ওস্তাদ আয়েতআলী খাঁ- ফকির আফতাব উদ্দিন খাঁ- মহর্ষি মনোমোহন দত্ত স্মরণে নজরুল ইন্সটিটিউট কেন্দ্র, কুমিল্লায় অনুষ্ঠিত হয় ‘স্মরণ উৎসব’।
এ উপলক্ষ্যে খ্যাতিমান সংগীত গবেষক, খ্যতিমান সুরবাহার শিল্পী মোবারক হোসেন খানকে ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’ সম্মাননা-২০১৬ প্রদান করা হয়। অসুস্থতা জনিত কারনে তিনি সেদিন কুমিল্লায় যেতে পারেননি। তাই ২৫ নভেম্বর শুক্রবার রাতে ঢাকায় তাঁর বাসায় গিয়ে সম্মাননা পত্র ও ক্রেস্ট হাতে তুলে দিয়েছিলাম। তার মতো এমনই একজন যোগ্য ব্যক্তিকে সম্মান জানাতে পেরে নিজের ভেতর এক মহা আনন্দ অনুভব করলাম।
মোবারক হোসেন খানের মেয়ে প্রফেসর রীনাত ফওজিইয়া (বিখ্যাত সেতার শিল্পী), তিনি বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে যোগ দেন ১৯৯৩ সালে। বর্তমানে রাজধানীর গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনে উচ্চাঙ্গ সংগীত (সেতার) এ পাঁচ বছরের সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে এম ফিল করেন। চাকরীর পাশাপাশি সংগীতের বিষয় ছাত্রদের শিখিয়ে থাকেন।
বড় ছেলে তারিফ হায়াত খান বুয়েট এর আর্কিটেকচার বিভাগ থেকে গ্রাজুয়েশন করে স্কলারশিপ নিয়ে বেলজিয়াম থেকে এম আর্ক এবং হংকং থেকে পি এইচ ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রথমে হংকং পলিটেকনিক ইউনিভার্সিতে লেকচারার ও বর্তমানে মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি টেকনলজিতে সিনিয়র লেকচারার হিসেবে কর্মরত আছেন। ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তন থেকে তবলায় পাঁচ বছর মেয়াদী কোর্স সম্পন্ন করেন। এছাড়া ওস্তাদ শাহাদত হোসেন খানের কাছে সরোদ শিক্ষা করেন।বর্তমানে প্রবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরীর পাশাপাশি সংগীতের দুই বিষয় ছাত্রদের শিখিয়ে থাকেন।
ছোট ছেলে তানিম হায়াত খান রাজিত (সরোদ শিল্পী)। তানিম একজন কোয়ালিফাইড অ্যাকাউন্টেন্ট। তানিম একজন MBA। অস্ট্রেলিয়ার University Of Technology (UTS) থেকে উনি প্রফেশনাল একাউন্টিং এ MBA করেছেন। এর আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট এর উপর BBA করেন। পেশাগত ভাবে তানিম একজন accountant। সিডনি তে চার্টার্ড ফার্মে বেশ কিছুদিন কাজ করে তানিম এখন হেড অফ একাউন্টিং এন্ড ফাইন্যান্স হিসাবে TAFE Digital, ডিপার্টমেন্ট অফ এডুকেশন এন্ড ট্রেনিং, নিউ সাউথ ওয়েলসে কর্মরত আছেন।। তিনিও প্রবাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরীর পাশাপাশি সংগীতের বিষয় ছাত্রদের শিখিয়ে থাকেন।
মোবারক হোসেন খান তার পিতা সুরসাধক ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁর সমাধি সংরক্ষণে ‘ঐতিহ্য কুমিল্লা’র প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের নেয়া সংস্কারের উদ্যোগের কথা জেনে অন্ত্যান্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। পরে সেটি বাঁধার মুখে পড়ে। অবশে বর্তমানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কুমিল্লার তমছম ব্রীজে সমাধিটি সংস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে না ফেরার দেশে মোবারক হোসেন খান। (ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
২৩ নভেম্বর শনিবার দিবাগত রাতে রাজধানীর রামপুরাস্থ নিজ বাসভবনে ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যান তিনি। তার সন্তানরা দেশে এলে মরহুমের জানাজা ও দাফন অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমানে তার মরদেহ বারডেম এর হিমঘরে রাখা হয়েছে ।
পিতার সমাধিটি সংস্কার দেখার আগে নিজেই পারি জমালেন না ফেরার দেশে। এই আক্ষেপ তার নয়, আমার।
(তথ্যসূত্রঃ মোবারক হোসেন খানের সাক্ষাৎকার; সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান; নাট্যজন আলীযাকের; তানিম হায়াত খান রাজিত; উইকিপিডিয়া।
লেখক জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল  
পোস্টটি শেয়ার করুন